স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনে অভিযুক্ত বিডিওর বিরুদ্ধে শিক্ষা দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ
শিলিগুড়িতে স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের অভিযুক্ত বিডিওর বিরুদ্ধে শিক্ষা দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ
বিধি ভেঙে একের পর এক আইন ডিগ্রি, এলএলবি–এলএলএম ও পিএইচডি কোর্স ওয়ার্কে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত কমিটির দাবি
শিলিগুড়ি: স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে খুন এবং দেহ লোপাটের চেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্ত বিডিও প্রশান্ত বর্মনের (Prasanta Barman) বিরুদ্ধে এবার উঠল ভয়াবহ শিক্ষা দুর্নীতির অভিযোগ। নিয়মকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক আইন ডিগ্রি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে এই কীর্তিমান প্রশাসনিক আধিকারিক।
অভিযোগ, কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল জয়জিৎ চৌধুরীর সঙ্গে যুক্ত শিলিগুড়ির মাটিগাড়ার একটি আইন কলেজ থেকেই বিধি ভেঙে রেগুলার কোর্সে তিন বছরের এলএলবি ডিগ্রি পেয়েছেন প্রশান্ত। বর্তমানে সেই কলেজ থেকেই তিনি রেগুলার এলএলএম কোর্সে পড়ছেন। সংশ্লিষ্ট আইন কলেজটি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় (NBU) অনুমোদিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, রেগুলার কোর্সে পরীক্ষায় বসতে হলে প্রতি সেমেস্টারে কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। অথচ বিডিওর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলে প্রশান্ত যে ওই পরিমাণ ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। তাহলে কীভাবে তিনি একের পর এক পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেলেন—তা নিয়েই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
এমনকী, ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষার নম্বর কেলেঙ্কেরিতে অভিযুক্ত প্রশান্ত আদৌ পরীক্ষায় বসেছিলেন কি না, নাকি পরীক্ষা না দিয়েই সার্টিফিকেট পেয়ে গিয়েছেন—তা তদন্তের দাবিও উঠেছে। এলএলএম কোর্সে প্রথম ও দ্বিতীয় সেমেস্টারের পরীক্ষা দিয়ে ইতিমধ্যেই পাশের মার্কশিট হাতে পেয়েছেন তিনি। রোল নম্বর ২৪১০২৩১৪০০০৪ এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০৮১১৪০৬০১০০০৯। প্রথম সেমেস্টারে তাঁর এসজিপিএ ৯.১৩ এবং দ্বিতীয় সেমেস্টারে ৮.৬৩।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এলএলএমের তৃতীয় সেমেস্টারের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। তার আগে ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ফর্ম ফিলআপ। তবে প্রশান্ত আদৌ সেই পরীক্ষায় বসতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে আইন কলেজের চেয়ারম্যান ও অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল জয়জিৎ চৌধুরী দাবি করেছেন, বিধি ভেঙে কাউকে পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্য, “এলএলএমের ক্ষেত্রে অনেক কলেজেই উপস্থিতির বিষয়ে কিছুটা শিথিলতা থাকে। তবে এলএলবি’র ক্ষেত্রে আমরা কড়াকড়ি করি। প্রশান্ত স্পেশাল কেউ নন। প্রয়োজনীয় উপস্থিতি না থাকলে ফর্ম ফিলআপ করতে দেওয়া হবে না।”
তবে শুরু থেকেই কেন বিধি মানা হয়নি এবং কীভাবে প্রশান্ত একের পর এক পরীক্ষায় পাশ করলেন—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
শুধু আইন ডিগ্রিতেই থেমে থাকেননি প্রশান্ত। অভিযোগ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বাংলায় পিএইচডি’র কোর্স ওয়ার্কও করেছেন নিয়ম ভেঙে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, কোর্স ওয়ার্ক ছয় মাসের রেগুলার প্রোগ্রাম, যেখানে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রশান্তকে নিয়মিত ক্লাস করতে দেখেননি কেউই।
নবান্ন সূত্রের খবর, কোর্স ওয়ার্ক করার জন্য প্রয়োজনীয় ছয় মাসের ছুটিও নেননি প্রশান্ত। তা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেলেন এবং কার সুপারিশে তা সম্ভব হল—তা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। ১ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে ডিপার্টমেন্টাল রিসার্চ কমিটির জরুরি বৈঠকে তাঁর কোর্স ওয়ার্কের ফলাফল অনুমোদন করা হয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, ২০২১ সালে পিএইচডি কোর্স ওয়ার্ক করার সময়ই প্রশান্ত ছিলেন এলএলবি (রেগুলার কোর্স)-এর ছাত্র। অর্থাৎ একইসঙ্গে দুটি রেগুলার কোর্সে পড়াশোনা—যা আইনত সম্ভব নয় বলেই মত শিক্ষাবিদদের।
প্রাক্তন উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্যের আমলেই এসব অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও আধিকারিকই এই বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না। প্রশাসনিক মহলের একাংশের দাবি, প্রশান্ত বর্মনের শিক্ষা দুর্নীতি নিয়ে স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন করে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।